বুধবার, ২৫ জুন, ২০১৪

সেই যে জোছনাপ্রিয় জোনাকিরা





 সে এক সময় ছিলো যখন বিকেল শেষে সন্ধের গভীর আয়োজন শুরুর সঙ্গেসঙ্গেই বাংলার মাঠের ধারে ঘরের পাশের উঠোনতলে ঝোপঝাড়ে সবুজ জোনাকিরা জোছনা গন্ধে দারুণ ঝিকিমিকি জ্বলতো নিভতো যেন বা কোন স্বপন পারের আলোকবার্তা লয়ে এসেছে ওরা ধরায়। অন্ততঃ আমার এমনই লাগতো সেই উড্ডীন বেলায় যখন আমারও বয়স ষোল। আজও মন স্পর্শকাতর হয় সেসব দিনের স্মরণে। মনে আছে যেদিন প্রথম পড়েছিলাম জীবনানন্দের "বনলতা সেন" - সেদিন রাতভর মাথায়-মগজে উড়েছে শুধু আশ্চর্য অইসব শব্দের গুঞ্জনাদি - যেন বা আমি-ই সেই সে নাটোরের পাখির নীড়ের মতোন দুচোখের অধিকারিনী ! আমারেই যেন বা হালভাঙা সে কোন নাবিকের বিজন মুখোমুখি বসিবার অন্ধকার জ্বেলেছে প্রাকৃতিক ভাষায় - আমি তারই তরে আকুল-ব্যাকুল বাঙ্ময় শুধিয়েছি গভীর - "এতদিন কোথায় ছিলেন?" ... আদতে বয়সটা তখন অমনই ছিলো যে - যা কিছু চারপাশের জ্যোর্তিময় - দ্যোতনাময় তার তরেই হৃদয় বিষম উতসাহময়। এখন আজকের জৌলুসময় জগতে এই সহজ অথচ গভীর উতসাহ কালের বড়োই অভাব। কেউ কাহার কথায় অথবা ভাবে দুদন্ড গভীর উতসাহিত করবার কথা তো বহু দূরের কথা - সময় নিয়ে পাঠের উতসাহ পর্যন্ত নেই। রাজ্যের রমরমা ইউটিউবভর্তি - অনলাইন নিউজভর্তি - টিভি চ্যানেলভর্তি - মিডিয়াভর্তি বাণিজ্যলোভী ধান্দাবাজ চোখল চোখগুলি কোমলমতি বালক-বালিকাদের এমনই যন্ত্রনির্ভর করে তুলেছে যার কারণে কেউ এখন আর বনেবাদাড়ে জোছনাজোনাক খুঁজে বেড়াতে যায়না ভুলেও। শুধু অতীত সে কোন কালের গাঁথা রূপেই রূপকথা-চুপকথা হয়েই বইয়ের তাকের সারিতে ধূলোয় ধূসর পুরনো বইগুলো। তারই ভাঁজেভাঁজে লুকোনো ছিন্নপাতার তরণী যেন অজস্র জোনাকির সবুজ সজল জোছনাপ্রিয় সন্ধেগুলি। কেবল আমাদের মতোন কিছু বয়েসি প্রবীন সিটিজেনের অবেলার অবকাশের লেখালিখির ফাইলে - ব্লগে তাদের খুঁজে পাওয়া - আজকের কেউ কি আদতে সময় করে পড়বে কি না পড়ে ঝেড়ে ফেলবে ডিলিটের ফরএভারে তাও জানিনা। তবু কি জানি কি ভেবে লিখেই রাখলাম আজি এ আষাঢ় সন্ধ্যায়। আমারই অনেক আগের একটা সন্ধ্যেকাব্য সংযোজনা করে দিলাম। 

সন্ধ্যেকাব্যজাল 
~ নুরুন্নাহার শিরীন   
~~~~~~~~~~~~~ 
তখন আমার পাশে সন্ধ্যে এসে বসে।
তখন আমার পাশে সন্ধ্যে বেজে ওঠে।
ভাবি - সন্ধ্যে কি আসেনি আগে?  
ভাবের জবাব আসে - এসেছিলো বটে।
ভাবি - সন্ধ্যে কি বাজেনি আগে? 
          ভাবের তড়িত কাব্য - তখনতো ছিলোনা গা সান্ধ্যকাব্যে।
আজ যেমন সে আয়োজনে-অপহ্নবে 
বিসর্জনের বাজনাতলে আজ এমন সে! 
এমন গ্রহণযোগ্য সাড়ম্বরে ঘনিয়ে উঠলো - 
সারা দিনমানের বেদনাজালে জমিয়ে উঠলো! 
সন্ধ্যের সমস্ত বাঁক বিষম জোছনাপ্রিয় - 
সন্ধ্যের সমস্ত ঝাঁক পথের অপ্রিয় - 
যত মৃত্যু ধান্দাবাজ ভোর থেকে রাত - 
যত বাণিজ্যলোভীর তীব্র গন্ধরাজ - 
সমস্ত ফেলেই আজ 
সন্ধ্যের বিভায় আমারই ক্ষয়িষ্ণু দুহাত! 
সমস্ত ফেলেই আজ 
সন্ধ্যের মাথার 'পরে পুরাতন ভরা দৃষ্টিপাত!
ভাবি - সন্ধ্যে কি আসেনি আগে? 
ভাবের জবাব সেই - একই হ্যাঁ এসেছিলো বটে! 
ভাবি - সন্ধ্যে কি বাজেনি আগে? 
ভাবের তড়িত কাব্য - বেজেছিলো বটে! 
কেবল তখন তত গজায়নি বোধী ডালপালা। 
তখন ছিলোনা তত বোধনের গ্রহণের পালা। 

১৪২১ বঙ্গাব্দ।।   
 


1 টি মন্তব্য: